আরও ডালপালা বিস্তার করে এগিয়ে চলো, মেরিনার্স বেসক্যাম্প — মৃন্ময় দে

মেরিনার্স বেসক্যাম্প, দীর্ঘ সমর্থক জীবনে অগনিত ম্যাচে মোহন গ্যালারিতে বসার পরেও এটা বলতেই হবে মোহনবাগানের নানারকমের ফ্যান্স গ্রুপের মধ্যেও এই গ্রুপ আমার কাছে আজ অনন্য। না ওদের ওয়েবসাইটে লিখতে হবে বলে কারণ থাক বা না থাক ওদের নিয়ে চারটি ভালো ভালো কথা লেখার জন্য এই কথা আমি বলছি না। যা বলছি তার মধ্যে আমার নিজস্ব যুক্তি – ভাবনা ও বিশ্লেষণ যথেচ্ছ পরিমাণে মিশিয়েই এ কথা আমি বলছি। আর এ কথা বলতে গিয়ে আমি কোন মুহূর্তেই বাকি ফ্যান্স গ্রুপগুলোকে এক ফোঁটা ছোট করছি না। সব না হোক কিছু ফ্যান্স গ্রুপ অবশ্যই নানান সদর্থক কাজ করে চলেছে যা অবশ্যই প্রশংসনীয়। আসলে এ কথাগুলো আমি বলছি ফ্যান্স গ্রুপগুলোর কাজের মূল্যায়ন করার মতো কিছু অভিজ্ঞতার নিরিখে কারণ ভারতবর্ষের ফুটবল ইতিহাসের (সম্ভবত) প্রথম সোসাইটি আ্যক্টে রেজিষ্টার্ড যে ফ্যান্স গ্রুপ, সেই ‘গ্রীণ আ্যন্ড মেরুণ’ এর ২০০৪ সালে জন্মলগ্ন থেকে আমি তার অন্যতম অংশীদার ছিলাম। সেই গ্রীণ এন্ড মেরুণ এর নানারকমের নতুন স্বাদের এবং প্রথম করা কাজের এবং পরবর্তীকালে আরও কিছু ফ্যান্স গ্রুপের কাজকর্মের সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা আমার অনেক দিনের। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই আমার এই বিশ্লেষণ আমি করছি ও বক্তব্যটুকু রাখছি। আসলে মজাটা এখানেই যে মেরিনার্স বেসক্যাম্প আদতে কোন ‘অর্থডক্স’ ফ্যান্স গ্রুপই না, এরা আসলে ‘আলট্রাস’ গ্রুপ। আর আলট্রাস কালচার আমাদের মোহন গ্যালারিতে প্রথম ইনডাক্ট করেছে – মোহনবাগানীদের সাথে পরিচিত করেছে এরাই। এবং এটা বলতে কোন দ্বিধা নেই যে আমার নিজেরও এই আলট্রাস কালচার সম্পর্কে কোন নির্দিষ্ট ধারণা ছিল না। এদিক – ওদিক থেকে বিক্ষিপ্ত ভাবে কিছু পড়ে – দেখে ও জেনে ভালো মন্দ মেশানো একটা অভিজ্ঞতা এবং বলা ভালো যে আলট্রাস সংস্কৃতি (কালচার) সম্পর্কে বরং মন্দ (নেগেটিভ) ভাবনাটাই আমার মধ্যে বেশি ছিল। মনে করতাম খেলা চলাকালীন গ্যালারিতে বসে বিপক্ষের সমর্থকদের সাথে এবং খেলার আগে ও পরে স্থানীয় প্রশাসনের সাথে পায়ে পা দিয়ে ঝামেলা করাই বোধহয় আলট্রাসদের এক ও একমাত্র কাজ। আসলে ইংল্যান্ড – আর্জেন্টিনার জাতীয় ফুটবল দলের এবং Galatasaray ক্লাব দলের সমর্থকদের একাংশের নানান ধ্বংসাত্মক কীর্তিকলাপের কথা জেনেই আমার এই এলোমেলো ধারণা গড়ে হয়েছিল। এবং আবারও বলছি আমার এই অজ্ঞতা আমূল বদলে দিল আমাদেরই এক আলট্রাস গোষ্ঠী, মেরিনার্স বেসক্যাম্প।
অবাক হয়ে দেখলাম এক ঝাঁক উচ্ছল ও প্রাণচন্চল ছেলে মেয়ে মিলে ময়দানী গ্যালারির একটা বড় অংশ দর্শকদের যা পেটেন্ট নেওয়া সেই খিস্তি খেউর এবং কুৎসিত অঙ্গভঙ্গি করার পরিবর্তে খেলা চলাকালীন সারাক্ষণ নিজেদের তৈরি করা নানা গান – শ্লোগান এবং তার সাথে সঙ্গতি রেখে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে এরা গ্যালারিকে পুরো অন্যমাত্রায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এমনকি ম্যাচের পরিস্থিতি ও ফলাফল যখন আমাদের পক্ষে মোটেই অনুকূল নয় তখনও এদের নিজের টিমকে চাগিয়ে যাওয়ার মরিয়া প্রয়াস বন্ধ হচ্ছে না এবং যা আমাদের টিপিক্যাল ময়দানী কালচারের সাথে একদমই খাপ খাচ্ছে না। এইভাবেই চলতে চলতে অত্যন্ত ভালোলাগা মিশ্রিত এক নতুন চমক লাগলো ২০১৬ সালে বারাসতে আইলিগের একটা ম্যাচের গ্যালারিতে বসে। অবাক হয়ে দেখলাম আমাদের গ্যালারিতে অজস্র সঞ্জয় সেন (আমাদের তৎকালীন কোচ) কে। হ্যাঁ ওরা এইভাবেই সন্জয় সেনের উপরে অবিচারের প্রতিবাদ করতে গিয়ে ভারতীয় ফুটবলের নিরিখে এক অভিনব কিন্তু ভীষণই কনস্ট্রাকটিভ পন্থা নিয়েছিল। আর শুধু মুখোশের কথাই বা বলি কেন? শিলিগুড়িতে আইলিগের এক ডার্বিতে প্রবলভাবে ইষ্টবেঙ্গল সমর্থক পরিবেষ্টিত শিলিগুড়ির মতো শহরে উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে আমাদের গ্যালারির সামান্য অংশ বরাদ্দ করার পরেও সেদিন গোটা ম্যাচে আমাদের গ্যালারি যে কখনই বিপক্ষের সাথে গ্যালারির লড়াইতে এক মুহূর্তেও পিছিয়ে পড়েনি তারও প্রধান কারণ ছিলো খেলার শুরুতে মেরিনার্স বেসক্যাম্প এর নামানো রক্ত গরম করা এক বিশাল টিফো। খেলা শুরুর আগেই আমাদের লড়াই করার প্ল্যাটফর্মটা ওরা তৈরি করে দিয়েছিল। হ্যাঁ এ কথা আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি নিজে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে গ্যালারিতে উপস্থিত থাকার সুবাদে। এইভাবেই ‘আল্ট্রাস’- ‘টিফো’ এই শব্দগুলো ধীরে ধীরে আমার কাছে পরিচিতি পেতে লাগলো। কিন্তু তখনও আরও একটা শব্দের সাথে পরিচিত হতে বাকি ছিলো, ‘পাইরো শো’। যা ওরা করে দেখালো সম্ভবত পরের বছরে অর্থাৎ ২০১৭ সালে বারাসতে আইলিগেরই আর এক ম্যাচে। সে এক অনবদ্য অভিজ্ঞতা। এর আগে সেই ৮০ এর দশকে তখনকার কলকাতা লিগের চরম উত্তেজনাকর এবং ভরা গ্যালারিতে বসে আমি নিজে স্মোক বম্ব নিয়ে অনেকবার সেলিব্রেশন করেছি। কিন্তু এই পাইরো শো সম্পূর্ণ আলাদা এক অভিজ্ঞতা। আরও মজার লাগতে লাগলো এদের তথাকথিত অদ্ভুত সাজসজ্জা। শুধুমাত্র চোখ দুটোকে বাইরে রেখে বাকি মুখ মোহনবাগানের স্কার্ফ দিয়ে ঢেকে দিয়ে এদের ঐসব পাইরো শো সত্যি কথা বলতে আমাকে আমাদের মোহন গ্যালারির বিষয়ে নতুনভাবে উজ্জীবিত করলো। এবং এই উজ্জীবিত হওয়ার কারনেই মেরিনার্স বেসক্যাম্প এর সাথে আমি দরকারে আমার ক্ষুদ্র সামর্থ্য অনুযায়ী সামান্য কিছু আর্থিক অনুদান দিয়ে এবং কখনো কখনো সশরীরে থাকার মধ্যে দিয়ে কিছুটা হলেও কাছে আসতে থাকলাম। এবং এবারে একেবারে সামনে থেকে দেখলাম ছেলে – মেয়েগুলোর (এমনকি এদের কাউর কাউর বাড়ির লোকেরাও)
এক একটা প্রজেক্ট নামাতে গিয়ে কিভাবে এবং কতটা আর্থিক এবং শারীরিক চাপ নিয়ে কাজগুলো করে চলেছে। আক্ষরিক অর্থেই অনুভব করলাম যাকে বলে ‘ঘরের খেয়ে মোহনবাগানের মোষ তাড়ানো’র কাজ। এবং এক আধবার নয়, সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মেতে থেকে এরা বারবারই এক একটা আইকনিক কাজ করতে করতে
আজ আমাদের মোহনবাগানীদেরই বারবার গর্বিত করে চলেছে। অথচ সবথেকে মজার এবং একই সাথে চরম লজ্জার এটাই যে আমাদের চিরকালীন ‘কাঁকড়া’ কালচার অনুযায়ী আমাদেরই এক শ্রেণীর সমর্থকরা এদের স্বচ্ছতা, স্বদিচ্ছা নিয়েই প্রশ্ন করে চলে। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে সম্পূর্ণ বিপরীত কথা। এরা সবসময়ই ‘অন্তত আমার জানা ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অনুযায়ী’ ক্রাউড ফান্ডিং এর উপরে নির্ভর করে পথ চলে এবং সেক্ষেত্রে এরকমও অভিজ্ঞতা আমার নিজেরই হয়েছে যে কোন একটা প্রজেক্টের ক্ষেত্রে আমার বা আমার বন্ধুদের টাকা ওদের দেওয়া আ্যকাউন্টে পাঠাতে গিয়ে ওরাই বারণ করে বলেছে যে ‘দাদা এবারকার মতো টাকা উঠে গেছে, এখন আর লাগবে না।’ তাই আমার অভিজ্ঞতা বলে এই ধরনের নেগেটিভ আ্যটিচিউড না দেখিয়ে তার পরিবর্তে শ্রম বা অর্থ দিয়ে না পারি অন্তত আমাদের সহমর্মিতাটুকু যদি এদের জন্য বরাদ্দ করতে পারি এবং আমাদের নানা স্তরের স্থানীয় প্রশাসন যদি এদের প্রতি নূন্যতম প্রশাসনিক সাহায্যটুকু করতে পারে তাহলে এরা কিন্তু আমাদের ফুটবল গ্যালারিকে আরও অনেক বেশি আকর্ষণীয় এবং রুচিশীল করে তুলতে পারবে। যা এরা ইতিমধ্যেই অনেকটাই করে তুলতে পেরেছে আর তাই আমিও আমার সদ্য কিশোরী মেয়েকে এদের মাঝখানে রেখে নিশ্চিন্তে খেলা দেখতে পারি।
এইভাবেই এগিয়ে চলো, না শুধুই এইভাবেই এগিয়ে চলো না, আরও ডালপালা বিস্তার করে এগিয়ে চলো, মেরিনার্স বেসক্যাম্প। আমার ও আমার মতো অজস্র মোহনবাগানীর সবুজ শুভেচ্ছা ও মেরুণ ভালোবাসা অবশ্যই তোমাদের সাথে থাকবে।